Saturday , 27 February 2021
Home / মতামত / পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা গুদাম সরেনি

পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা গুদাম সরেনি


পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা গুদাম সরেনি

অনলাইন ডেস্ক:

প্রকৌ. মো. আবদুস সোবহান
নিমতলী ট্র্যাজেডির ৮ বছর পার হলেও পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা গুদাম দোকান সরেনি। বরং অলিতে-গলিতে গড়ে উঠছে রাসায়নিকের কারখানা, গুদাম ও দোকান এবং প্লাস্টিক, পলিথিন ও জুতার কারখানা। এসব কারখানা গুদামে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। নিমতলী এলাকায় রাসায়নিকের পুরাতন গুদামের সংখ্যা কমে এলেও আবার নতুন গুদাম গড়ে উঠেছে, রয়েছে প্লাস্টিকের অনেক কারখানা। নিমতলীসহ পুরান ঢাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকা। যেখানে পুরান ঢাকাবাসী রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের সাথে বসবাস করছে।পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা গুদাম সরেনি২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক পদার্থের গুদামে বিস্ফোরণে সংগঠিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জন মারা যান এবং অনেকে আহত হন। অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতায় সারা দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। ৪ জুন দেশের মসজিদসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা এবং ৫ জুন এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। দেশে বড় ধরনের যেকোন দূর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদস্ত কমিটি গঠন করে থাকে এবং তাদের কর্মতৎপরতা দেখা যায়। পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ে। নিমতলীর ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। দূর্ঘটনার পরপরই সরকারিভাবে বিভিন্ন কমিটি করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গঠিত কমিটি পুরান ঢাকাসহ ঢাকার সকল রাসায়নিক কারখানা গুদাম ও দোকানের জন্য অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি এলাকা গড়ে তোলার সুপারিশ করে। দীর্ঘ ৮ বছর পার হলেও কমিটির সুপারিশ আজও আলোর মুখ দেখেনি।



রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের ব্যবস্থাপনায় সামান্য ত্রুটির কারণে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। তারই প্রমাণ নিমতলীর একটি ভবনের নিচতলার রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে আগুন লেগে মুহূর্তেই তা বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়া এবং ১২৪ জনের প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া। রাসায়নিক এসব কারখানা, গুদাম, দোকানে আগুন নিভানোর নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনীয় রাস্তার অভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। অনেক সময় অগ্নিকান্ডস্থলের কাছে জলাধার না থাকায় পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়। পুরান ঢাকার রয়েছে গৌরবোজ্জল এক ইতিহাস। কালের বিবর্তনে আজ তা হারিয়েছে যাচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকাবাসী বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একদিকে প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা-ঘাট, নালা-নর্দমা, উম্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, পার্ক, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা। অন্যদিকে পুরা এলাকা একটি মিশ্র এলাকা হিসাবে গড়ে উঠেছে। যেখানে একই সঙ্গে অবস্থান করছে আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা, কেমিক্যালের গুদাম, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া একই ভবনে রয়েছে শিল্পকারখানা, রাসায়নিক দাহ্য পদার্থসহ বিভিন্ন মালামালের গুদাম ও দোকান, বাণিজ্যিক কর্মকান্ড এবং আবাসিক ফ্ল্যাট।

জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন -এর উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা এবং ভবনের মালিক ও রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া ও অসচেতনার কারণে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকান্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটছে। ঢাকা মহানগরীতে এক হাজারেরও বেশী কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম রয়েছে। যার প্রায় ৮৫০টি পুরান ঢাকায়। এগুলোর মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশী অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশনের ছাড়পত্র বা লাইসেন্স গ্রহণের বিধান রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম পরিচালনার কোন সুযোগ নেই। তারপরও ছাড়পত্র বা লাইসেন্স ছাড়া এগুলো চলছে। সরকারি সংস্থার দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার অভাবই এর প্রধান কারণ।

আবাসিক এলাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, শিল্পকারখানা ও দোকান সরিয়ে নেয়া না হলে নিমতলীর মতো আবারও যেকোন সময় বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরান ঢাকায় বিদ্যমান বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, শিল্পকারখানা ও দোকানগুলো ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার জনজীবন, জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই জরুরীভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা এবং পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও দোকান সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কঠোরভাবে প্রয়োগ করা আবশ্যক। লেখক: সাধারণ সম্পাদক, পবা এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর