অভাবে কোলের শিশু সন্তানকে পানিতে ফেলে দিলেন মা

শুক্রবার (২৯ জানুয়ারি) সকালেঘটনাটি ঘটেছে বলদিয়া ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামে।

স্থানীয়রা জানান, এক বছর আগে এক মাসের কোলের সন্তান জাহিদকে নিয়ে স্বামী হাফিজুর রহমানের বাড়ি রংপুর থেকে বিতারিত হন তিনি। এরপর আশ্রয় জোটে পূর্ব কেদার গ্রামের দরিদ্র বাবা জয়নাল মিয়ার বাড়িতে আসেন। দিনমুজুর বাবার বাড়িতে অভাব অনটন থাকায় তার সন্তানের ভরন পোষণ নিয়ে প্রায় দ্বন্দ্ব হতো পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে। সন্তানের খাবার এবং খরচ চালাতে মাঝে মধ্যে তাকে নানা নির্যাতন সহ্য করতে হতো।
জমিলা বলেন, ‘শুক্রবার আমি দু’কেজি চাল সবার আড়ালে বিক্রি করে বাচ্চার জন্য খাবার ও তেল-সাবান কিনে আনি। এজন্য বাবা রাগারাগি করে আমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন। মনের দুঃখে অবুঝ শিশুকে নিয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। শারিরীক আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে সন্তানকে পানিতে ফেলে দেবার সিদ্ধান্ত নেই।
জমিলার বাবা দিনমজুর জয়নাল মিয়া জানান, সকালে তিনি তার ছেলে মাটি কাটতে যান। মাটিকাটার স্থানে অদুরে মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পেয়ে সামনে এগিয়ে সেখানে জানতে পারেন জমিলা তার ছেলেকে পানিতে ফেলে পালিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘দুই বছর আগে রংপুরের মর্ডাণ মোড়ের ভর্ত কবিরাজের ছেলে হাফিজুরের সাথে জমিলার বিয়ে দেই। বিয়ের এক বছর পরেই দুই মাসের কোলের শিশুকে নিয়ে সংসার ভাঙে জমিলার। এসময় জাহিদকে নিয়ে তার বাড়িতে ফিরে আসে জমিলা। অন্যদিকে বড় মেয়ে জরিনার স্বামী তার খোঁজ খবর না রাখায় তিন সন্তানসহ আমার সংসারে ফিরে এসেছে। একজনের শ্রমে পরিবারের ৯জন সদস্যের ভরণ পোষন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। দিনমুজুরী করে এই বিশাল সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় আমাকে।’
জমিলার মা জোবেদা বেগম জানান, প্রায় জমিলার সন্তান নিয়ে পরিবারে অশান্তি লেগেই থাকতো। তার খরচ চালাতে চাইতো না জমিলার বাবা। এনিয়ে সংসারে ঝগড়া লেগে থাকে।
জমিলার বৃদ্ধা নানী সুফিয়া বেওয়া বলেন, তার ভিক্ষাবৃত্তির চাল দিয়ে মাঝে মধ্যে জমিলার সন্তানের খরচ চলতো। অভাবের সংসারে জমিলা তার সন্তানকে অনেক কষ্ট সহ্য করে।
প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল হোসেন সন্তোষ বলেন,সকাল নয়টার দিকে বাড়ি থেকে তিনি ওই পথে বাজারে যাচ্ছেন। এসময় ব্রিজ দিয়ে যাবার সময় এক মহিলাকে কিছু পানিতে ফেলতে দেখি। কিছু পড়ার শব্দ শুনে নিচে তাকিয়ে দেখি একটি ছোট্ট শিশু পানিতে ভাসছে হাত-পা নাড়ছে। দ্বিগবিদিক না তাকিয়ে চিৎকার করি। এসময় চিৎকার শুনে স্থানীয় ফরিদুল ইসলাম এবং একজন পথচারী এগিয়ে আসেন। ব্রিজ থেকে নেমে সাঁতরিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করেন তারা। উদ্ধার করতে তাদের ১৫/২০মিনিট সময় লাগে। উদ্ধারের পর আগুন জ্বালিয়ে তাপ দিয়ে শিশুটিকে সুস্থ করা হয়। ব্রিজের পাশেই বাড়ি রফিকুল ইসলাম-এলিনা বেগম দম্পতির হেফাজতে রাখা হয় শিশুটিকে।
এলিনা বেগম বলেন, উদ্ধারের পর শিশুটিকে তিনি বুকের দুধ খাওয়ান। শিশুটির মাসহ অন্যান্য অভিভাবকরা দত্তক দিলে তিনি নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
পানিতে শিশু সন্তানকে ফেলার দেবার কথা স্বীকার করে বলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বলেন, শিশুটি আপাতত সুস্থ আছে। বর্তমানে রফিকুল-এলিনা বেগম দম্পতির কাছে রয়েছে। শিশুটিকে তার মায়ের কাছে ফেরত দেয়া হবে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা জানান,বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি। তবে খোঁজখবর নিয়ে ওই পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা আশ্বাস দেন তিনি।