Tuesday , 21 September 2021

কারাগারে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত সাক্ষাৎ, ইসলাম কী বলে

বন্দিদের সব ধরনের মৌলিক অধিকার ইসলামী শরিয়ত নিশ্চিত করে। তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সুচিকিৎসা, শিক্ষা ও বৈধ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎ কাজ ও সীমালঙ্ঘন; তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যেন তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)

আবু আজিজ বিন উমাইর (রা.) বলেন, আমি বদর যুদ্ধে বন্দি ছিলাম। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বন্দিদের প্রতি কল্যাণকামী হও।’ আমি একটি আনসার দলে ছিলাম। খাবার আনলে তারা নিজেরা খেজুর খেত। আর আমাকে রাসুল (সা.)-এর উপদেশ মতে জবের রুটি খেতে দিত।’ (ইবনে হিশাম, ৩/৫৭৯)শাসক বা বিচারক চাইলে বন্দির সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সাক্ষাতের অনুমোদন দিতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় যাপন করা যাবে না। (হাশিয়াতু ইবনে আবিদিন, ৫/২৮১)।

কারাবন্দিদের স্বামী-স্ত্রীসুলভ সাক্ষাৎ

কারাগারে বন্দিদের স্বামী-স্ত্রীসুলভ সাক্ষাতের সুযোগ না থাকায় দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনে বহু বিবাহিত ও অবিবাহিত নারী-পুরুষ বাধ্য হয়ে কিংবা জোরপূর্বক বিকৃত উপায়ে দৈহিক চাহিদা পূরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই বেশির ভাগ হানাফি ও হাম্বলি ফিকাহবিদের মতে, কারাবন্দির চারিত্রিক সংশোধন ও দৈহিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে স্ত্রীর বা স্বামীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা উচিত। তবে এর জন্য কারাগারে একান্ত নির্জনবাসের সুযোগ থাকা জরুরি। (হাশিয়াতু ইবনে আবিদিন, ৫/৩৭৮)ইসলামী আইনজ্ঞদের বেশির ভাগ দাম্পত্য সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত বলে মত দিয়েছেন। এতে কারাবন্দির দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি নিশ্চিত হয়। তবে সামগ্রিক পরিবেশ বিবেচনা করে বিচারক কল্যাণকর মনে করলে বন্দির এ অধিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন।

বন্দিদের পরিশুদ্ধিই মূল লক্ষ্য

আব্বাসি যুগের শুরুতে কারাগার ও কারাবন্দিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে খলিফা হারুনুর রশিদের প্রধান বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) কারাবন্দিদের আচরণবিধি নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেন এবং তা  ‘আল খারাজ’ গ্রন্থে যুক্ত করেন। তিনি ‘আল খারাজ’ গ্রন্থে কারাবন্দিদের অধিকার বিষয়ে ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর নির্দেশনা উল্লেখ করে বলেন, ‘কারাবন্দিদের প্রতি সদয় হও, যেন তাদের জীবনাবসান না হয়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করো। অশ্লীল কাজে লিপ্ত লোকদেরও বন্দি করার আগে নিশ্চিত হও। শাস্তি প্রয়োগকালে বাড়াবাড়ি কোরো না। বন্দিদের কেউ অসুস্থ হলে তার দেখাশোনা করো। কারাগারে নারীদের জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করো। বন্দিদের দেখাশোনার দায়িত্বে আস্থাবান ও নীতিবান ব্যক্তিকে নিযুক্ত করো। উৎকাচ গ্রহণকারীকে নয়, কারণ সে যেকোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে।’ (ইমাম আবু ইউসুফ, আল খারাজ, পৃষ্ঠা ১৫০)

আন্তর্জাতিক আইনে বন্দি স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের সুযোগ

আমেরিকার মিসিসিপি, আরেগন ও ক্যালিফোর্নিয়া কারাগারে গবেষণা করে দেখা যায়, স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বন্দির স্বামীর চরিত্রকে উন্নততর করে। তা ছাড়া কারাগারে বিরাজমান বিকৃত পদ্ধতিতে দৈহিক চাহিদা পূরণের প্রবণতা হ্রাস করে। দক্ষিণ আমেরিকার বহু কারাগার ও পশ্চিম ইউরোপের অনেক কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে সময় কাটাতে স্ত্রীদের আসার ব্যবস্থা করা হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন উপলক্ষে অনেক কয়েদিকে নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। (ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা, ১৪/১১০০, আহকামুস সিজনি ফি মুআমালাতিস সুজানা, পৃষ্ঠা : ৪৫৯)

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় (Universal Declaration of Human Rights) ধারায় বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে করা ও পরিবার গড়ার অধিকার তাদের আছে। এ অধিকার বাস্তবায়নে প্রথা, সমাজ, রাষ্ট্র বা ধর্মীয় কোনো বাধা-নিষেধ নেই। এ অধিকার বাস্তবায়নে কারাবন্দি ও আটক ব্যক্তিদের নিজেদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও স্ত্রীদের একান্ত নিবাসের সুযোগ দেওয়া অবশ্যক।

সুযোগ পাবে নারীবন্দিরাও

নারীবন্দিদের চিকিৎসা ও নারী অপরাধীদের পদক্ষেপ বিষয়ক জাতিসংঘের নীতিমালার (যা The Bangkok Rules নামে পরিচিত) ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়, স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে নারীবন্দিদেরও পুরুষদের মতো এ অধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে। বন্দির চারিত্রিক সংশোধন ও পুনর্বাসন করতে বন্দি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে শরিয়তসম্মত নির্জনবাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কেননা ইসলামী শরিয়ত কারাগারের ভেতর ও বাইরে থাকাবস্থায় দাম্পত্য জীবন সুদৃঢ় করার নির্দেশনা দেয়।

বিভিন্ন দেশে বন্দি স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে স্ত্রীদের সঙ্গে বন্দিদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। মিসরে কারাবন্দিদের নির্ধারিত সময়ের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর বহু বন্দিকে ঘরে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। সুদানে ১৯৯২ সাল থেকে বৈবাহিক সম্পর্ক সুনিশ্চিত হওয়ার পর বন্দিদের স্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। জর্দানের সংশোধন ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রকাশিত আইনের ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে এক বছর বা এর বেশি সময়ের সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা কেন্দ্রের নির্ধারিত স্থানে ‘শরিয়তসম্মত বৈবাহিক নির্জনবাস’ যাপনের সুযোগ পাবে। ২০০৫ সাল থেকে লিবিয়াতেও সংশোধন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর নির্ধারিত স্থানে চার মাসে কমপক্ষে এক ঘণ্টার জন্য স্ত্রীদের সঙ্গে স্বামীরা সময় কাটানোর সুযোগ পায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়।

সৌদি আরবে তিন মাসের বেশি সময়ের কারাবন্দিদের প্রতি মাসে তিন ঘণ্টার জন্য স্ত্রীদের সঙ্গে নির্জনবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। এ জন্য কারাগার ও অফিস থেকে নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থান প্রস্তুত আছে। এমনকি পারিবারিক সুসম্পর্ক দৃঢ় করতে স্ত্রীর জন্য নানা খাবার ও উপঢৌকনও আনার সুযোগ আছে। (সৌদি মন্ত্রিপরিষদের নির্বাহী আদেশ, ১৩ নম্বর ধারা, ১৭৪৫ নম্বর আদেশ, ১৭.৬.১৪১১ হি. প্রকাশিত)

ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, স্পেনসহ ইউরোপের অনেক দেশে বন্দিদের একটি নির্দিষ্ট সময় লোক দৃষ্টির আড়ালে প্রয়োজনীয় সুবিধাসম্পন্ন ছোট কক্ষে স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পায়। (হিউম্যান রাইটস মেথলজি ইন প্রিজন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, পৃষ্ঠা : ১০১)