Thursday , 21 October 2021

করোনার বিরুদ্ধে লড়াই বড় যোদ্ধা সেরাম

কাচের শিশির ঠুনঠুন শব্দ আর পিপিই পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ—এই হলো ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের ভেতরকার চিত্র। এই বর্ণনা শুনে বোঝার উপায় নেই, এটা বিশ্বের টিকা উৎপাদনকারী সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। আবার কারো পক্ষে এটাও কল্পনা করা সম্ভব নয় যে সেখানে কী বিশাল কর্মযজ্ঞই না চলছে! করোনা মোকাবেলার অংশ হিসেবে সেখানে প্রতিদিন উৎপাদন করা হচ্ছে লাখ লাখ টিকা। এসব টিকা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি পাঠানো হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। তাই করোনা মোকাবেলায় যে যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে চলছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ এক ‘খেলোয়াড়ের’ তকমা সেরাম ইনস্টিটিউট পেতেই পারে।

বর্তমানে অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত করোনার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ উৎপাদন করছে সেরাম। এই টিকার বিশেষত্ব হলো, ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা সংরক্ষণে যে বিশেষ অবকাঠামো লাগে, এটির ক্ষেত্রে তা লাগে না। সাধারণ রেফ্রিজারেটরের মাধ্যমে এটি সংরক্ষণ কিংবা পরিবহন করা যায়। ফাইজার কিংবা মডার্নার টিকার তুলনায় ‘কোভিশিল্ডের’ দামও কম। সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই টিকাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী।করোনা মহামারি শুরুর আগেও টিকা উৎপাদনের নেতৃত্ব সেরামের হাতেই ছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর গড়ে দেড় শ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করে। পোলিও, পনসিকা, মেনিনজাইটিস ও হামের জন্য বিশ্বের ১৭০টি দেশে প্রতিবছর শিশুদের যে টিকা দেওয়া হয়, তার দুই-তৃতীয়াংশ এই সেরাম ইনস্টিটিউটই সরবরাহ করে থাকে।

পুনাওয়ালা পরিবারের হাত ধরে ১৯৪৬ সালে ঘোড়ার খামার হিসেবে যাত্রা শুরু করে সেরাম। প্রথম কয়েক বছর সেখানে শুধু ঘোড়ার বাচ্চা উৎপাদন করা হতো। টিকা তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। মূলত যাত্রা শুরুর দুই দশক পরে এসে পুনাওয়ালা পরিবার উপলব্ধি করতে পারে যে প্রাণীর শরীর থেকে পাওয়া ‘রক্তাম্বু’ (রক্তের পাতলা স্বচ্ছ অংশ কিংবা সেরাম) দিয়ে টিকা তৈরি করা যেতে পারে। এই উপলব্ধির পর সেরামকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতের টিকার বাজার দখল করে নেয়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন ৪০ বছর বয়সী আদর পুনাওয়ালা। সম্প্রতি পুনে কারখানা সম্প্রসারণে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেন তিনি। ফলে করোনা মহামারি যখন শুরু হয়, তখন আগের চেয়ে আরো বেশি টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে সেরাম। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পর সেরামের মুনাফার পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি ডলার।আদর পুনাওয়ালা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁদের উৎপাদিত টিকার ৫০ শতাংশ ভারতের বাজারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। জুলাইয়ের মধ্যে ভারতের বাজারে ৩০ কোটি টিকা সরবরাহের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। আর দুই কোটি ডোজ সরবরাহ করা হবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে।

এর বাইরে ২০ কোটি ডোজ ‘কোভ্যাক্স’ উৎপাদনের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে সেরাম। একসঙ্গে এত টিকা উৎপাদনের চাপ প্রতিষ্ঠানটি সামাল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। তবে সেরামের নির্বাহী পরিচালক সুরেশ যাদব আত্মবিশ্বাসী। তাঁর ভাষায়, ‘অতিরিক্ত টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা কিংবা অভিজ্ঞতা—দুটিই সেরামের রয়েছে।’ সূত্র : এএফপি।