Home / বাংলা নিউজ / হাজারো পরীক্ষা স্থগিত, সেশনজট বাড়বে |

হাজারো পরীক্ষা স্থগিত, সেশনজট বাড়বে |


অনলাইন ডেস্ক:

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা গত বছরের মার্চে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে গত ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তখন পর্যন্ত বেশির ভাগ বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হলেও দুটি থেকে পাঁচটি বিষয়ের পরীক্ষা আটকে যায়। এর পর থেকে অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সম্প্রতি স্থগিত পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলেও আবারও তা আটকে গেল।

শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে আগামী তিন মাসে আটকে যাবে হাজারো পরীক্ষা। এতে নতুন করে আরো ছয় মাসের সেশনজটে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের। এমনকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও সৃষ্টি হবে সেশনজট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষাও আটকে গেল।   

হল খোলার দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত সোমবার ঘোষণা দিয়েছে সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে আগামী ২৪ মে থেকে। এই সময়ের মধ্যে অনলাইনে বা সরাসরি সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণাও দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এই ঘোষণার পর রাত থেকেই একে একে সব বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিতে থাকে। অথচ কিছুদিন আগেও পরীক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

নাম প্রকাশ না করে একজন সিনিয়র অধ্যাপক কে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব সময় তাদের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে। বিশেষ করে বড় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় এই স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে সব সময়ই পৃথক থাকার চেষ্টা করে। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছিল। অথচ তারাই আবার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কিছুটা হলেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ’

এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘খুবই অবাক হলাম, শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিক কাউন্সিল করে পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে। তারা যদি দু-চার দিন পরও একাডেমিক কাউন্সিলের সভা করত, তাহলে তো মন্ত্রণালয় বুঝত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত আরো ভেবেচিন্তে নেওয়াটা উচিত ছিল। তবে মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল খোলার যে ঘোষণা এসেছে, সেটা ঠিক আছে। বর্তমান মহামারিতে সরকার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু পরীক্ষাও নিতে পারবে না এই সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় থেকে না দিলেও পারত।’  

জানা যায়, গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণার পর এপ্রিল থেকেই অনলাইনে ক্লাস শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আর মে মাস থেকে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণেরও অনুমতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এমনকি আরো কিছুদিন পর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরাসরি ব্যাবহারিক পরীক্ষা গ্রহণেরও অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এখন তাদের আর কোনো ধরনের পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকল না। তিন মাস পরীক্ষা নিতে না পারলে তাদেরও প্রথমবারের মতো সেশনজটে পড়তে হবে।



এ ছাড়া গত জুন মাস থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। চলতি বছরের শুরু থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সেশনজট কমিয়ে আনার একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তবে হল খোলার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফের পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা আসায় বড় সংকটে পড়তে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে।

ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর কে বলেন, ‘আগামী ২৪ মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। আমি শিক্ষার্থীদের বলব, তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর দ্রুততার সঙ্গে তাদের ক্লাস-পরীক্ষা শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, পরীক্ষা শুরুর পরপরই শিক্ষার্থীদের হলে ওঠার আন্দোলন শুরু হয়। কারণ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হবে। আর তাঁদের বেশির ভাগেরই থাকার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল। ফলে হল খোলার আন্দোলন জোরালো হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী জোর করে হলে উঠে পড়ছেন। এতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তাই পরীক্ষা বন্ধ করলে শিক্ষার্থীরা আর হলে উঠতে চাইবেন না।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ঘোষণার সঙ্গে পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত আসাটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে অনলাইন ক্লাসে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাটাই পরীক্ষানির্ভর। আর পরীক্ষার সঙ্গে চাকরিসহ নানা বিষয় জড়িত। তাই অনলাইনে ক্লাসের সঙ্গে পরীক্ষা চলমান থাকলে সেশনজট অনেকাংশেই কমে আসত। এখন তিন মাস পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা আসায় পুরনো সেশনজটের সঙ্গে নতুন করে আরো ছয় মাসের সেশনজট যুক্ত হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে একাধিক পরীক্ষা চলমান ছিল। আগামী মার্চ থেকেও আরো একাধিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল, যা ফের আটকে গেল। এর মধ্যে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা, ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ, অনার্স চতুর্থ বর্ষ, বিভিন্ন প্রফেশনাল পরীক্ষা, ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষ, মাস্টার্স প্রিলিমিনারি অন্যতম। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই বছরে প্রায় ৪০০ ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এর সবটাই প্রায় আটকা পড়ে গেল।

জানা যায়, রাজধানীর সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকেই নানা সমস্যা চলছে। তবে সমস্যা কাটাতে সম্প্রতি কলেজগুলোতে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু তাদের পরীক্ষাও ফের আটকে গেল। এতে দীর্ঘ সেশনজটে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার গত রাতে কে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর এসব পরীক্ষা নেওয়া হবে।’

জানা যায়, এর আগে আগামী ১৩ মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে একাধিক পরীক্ষার তারিখও ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর গতকাল মঙ্গলবার জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক ডাকে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বৈঠক শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘১৩ মার্চকে কেন্দ্র করে যে পরীক্ষাগুলোর ঘোষণা ছিল, এগুলো স্থগিত করা হলো। একাডেমিক কাউন্সিল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে এখন বড় কোনো পরীক্ষা নেব না। বিভাগীয় পর্যায়ে নেওয়া হবে।’

-অনলাইন ডেস্ক