সাংহাই হাওরে বাঁধের নামে ৮২ লাখ টাকার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প |

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার সাংহাইর হাওরের ৬টি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ৮২ লাখ ৪১ হাজার ১৩৩ টাকা অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে নিয়োজিত উপজেলা কমিটিকে সুবিধা দিয়ে একটি মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট এই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো অনুমোদন করে বরাদ্দ লোপাটের চেষ্টা করছে। এই প্রকল্পগুলোকে প্রকল্পের ‘পেটের ভিতরের প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কৃষকরা। টাকা লুটে নিতে একটি হাওরকে দ্বিখণ্ডিত করতে এমন আজগুবি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

কৃষক নেতারা বলছেন, আন্দোলনের মুখে নিয়ে আসা পিআইসি প্রথাকে সমালোচিত করে আবার ঠিকাদারী প্রথায় নিয়ে যেতেই এভাবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করছে পাউবো। এতে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের পাশাপাশি প্রতিটি পিআইসি থেকে বিপুল অংকের টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, জামখলা হাওর, কাচিভাঙ্গা হাওর, সাংহাইর হাওর, খাই হাওর ও কাউয়াজুরী হাওরে প্রথম ধাপে ৪৯টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় উপসহকারী প্রকৌশলী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আঁতাত করে স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নতুন করে আরো ১৪টি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বৃদ্ধি করে। এতে সরকারের আরো ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে গোপনে বসে উপসহকারী প্রকৌশলী মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ে এই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি ও অনুমোদন করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ডুংরিয়া গ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে সাংহাইর হাওরের মধ্য দিয়ে পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বনুয়া গ্রামের সোনাহর খানের বাড়ি গিয়ে শেষ হয়। পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ১৯ ও ১৮নম্বর পিআইসির মাধ্যমে এখানে কাজ চলছে। এই দুই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এই দুই প্রকল্পের পশ্চিম দিকে ১০০-১৫০ মিটার দূরে শান্তিগঞ্জ-রজনিগঞ্জে এলজিইডির পাকা রাস্তা রয়েছে। তাই এই প্রকল্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ও সরকারের টাকা লোপাটের প্রকল্প বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।





পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বনুয়া গ্রামের ইব্রাহিম মিয়ার বাড়ির দক্ষিণ দিক থেকে হাওরের মধ্যখান দিয়ে আরেকটি প্রকল্পের কাজ শান্তিপুর হয়ে জয়সিদ্দি চাঁনপুর ভায়া খাসিপুর গ্রামের আলমগীরের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। এখানে ১৭, ১৬, ১৫ ও ১৪ নম্বর প্রকল্পে ৫১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৪ নম্বর প্রকল্পের শেষ প্রান্তে খাসিপুর গ্রামের আলমগীরের বাড়ির সামনে থেকে পশ্চিম দিক হয়ে আসামমোড়া স্লুইস গেট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার জায়গা খালি রয়েছে। একই সড়কে একদিকে মাটি ভরাট করলেও অন্যদিকে মাটি পড়েনি। তাই কেন এমন আজগুবি প্রকল্প নেওয়া হলো জানেন না এলাকাবাসী। এই ৬টি প্রকল্পের কারণে সাংহাই হাওরকে পুকুর বানানোর চেষ্টা বলছেও মনে করেন তারা। এতে আগামীতে হাওরের পানি নিষ্কাশনে বাধা হয়ে দাড়াবে বলে মনে করছেন কৃষকরা।

খাসিপুর গ্রার কৃষক ইব্রাহিম আলী বলেন, আমাদের এলাকায় পাউবো কেন এমন প্রকল্প নিল জানি না। এখানে ফসলরক্ষা বাঁধের প্রয়োজন নেই। আমাদের হাওরের মূল বাঁধ হলো খাই হাওরের বাঁধ। এখানে কাজ চলছে। তাই এখানে কেন আলাদা প্রকল্প দেওয়া হলো আমরা জানি না। 

একই গ্রামের কৃষক আসক আলী বলেন, ২০১৮ সাল থেকে এই হাওরে বাঁধের নামে লুটপাট চলছে। আমাদের রাস্তার প্রয়োজন আছে বটে। কিন্তু বাঁধের প্রয়োজন নেই। এখন হাওরকে পুকুর বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সিন্ডিকেট।

জয়কলস ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ মিয়া বলেন, খাই হাওরের চারপাশেই ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে সাংহাই হাওরে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেগুলোও প্রয়োজনীয়।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা প্রফেসর চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, একটি মধ্যস্বত্বভোগী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করে পাউবো আজগুবি প্রকল্প নিয়ে পিআইসিকে সমালোচিত করতে চাচ্ছে। কারণ তারা ঠিকাদারী প্রথায় ফিরতে চায়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দিয়ে তারাও নিজেদের আখের গোছাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকেই এখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তাই আমরা নতুন করে সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করিনি। এই প্রকল্পগুলো ২টি হাওরকে পৃথক করার জন্য নিয়েছি। তবে এসব বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার ভালো বলতে পারবেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এর দায় উপজেলা কমিটির উপর দিয়ে বলেন,  প্রকল্প নেওয়ার আগে উপজেলা কমিটি প্রকল্পের চাহিদা জেলা কমিটিতে পাঠান। সেই আলোকেই জেলা কমিটি উপজেলা কমিটির পাঠানো প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেন। 


-Kalerkantho