বাবা-মায়ের সেবা ও সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সাজা দিলেন আদালত! |

তিন মাদকসেবিকে সংশোধন হওয়ার ‘আদেশ’ দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের বিচারক মো. রাকিবুল হাসান রকি সংশোধনমূলক এ আদেশ প্রদান করেন। এতে বাবা-মায়ের সেবা, সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠানোর শর্ত, গাছ লাগানোসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এক রায়ে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামীদেরকে ২০১৮ সনের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ (১) এর সারণি ১৬-এ বর্ণিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে দন্ড আরোপ করা যৌক্তিক ও যথাযথ বিবেচিত হয়। তবে নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাদের বিরুদ্ধে পূর্বের কোন মামলা নেই অর্থাৎ তারা কোন পেশাদার অপরাধী নন। পেশায় তারা প্রত্যেকে সিএনজি চালক। এরূপ প্রথম অপরাধকারীদের শাস্তি হিসেবে যদি কারাগারে প্রেরণ করা হয় তাহলে দাগী অপরাধীদের সাহচর্যে তাদের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। 

আমাদের ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীকে সবক্ষেত্রেই সাজা আরোপ করা আইন সমর্থন করে না। কেননা শাস্তি প্রদানের অন্যতম উদ্দেশ্য সংশোধনমূলক, প্রতিহিংসামূলক নয়। এক্ষেত্রে অপরাধীকে সমাজের নিজ পরিমন্ডলে একজন প্রবেশন অফিসারের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে তার অপরাধ প্রবণতা সরিয়ে সু-প্রবৃত্তিকে ফিরিয়ে আনতে পারে। পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচীর মাধ্যমে আলোকিত জীবন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করতে পারে। এমতাবস্থায় তাদেরকে সমাজে একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং আইন মান্যকারী নাগরিক হিসাবে পুনর্বাসনের জন্য এবং সংশোধনের সুবিধার্থে দ্য প্রবেশন অফ অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০ এর ৫ ধারার আলোকে শর্ত সাপেক্ষে একজন প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে প্রবেশন প্রদান করা যুক্তিযুক্ত হবে।

আসামী পক্ষের আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর আলম কে বলেন, ‘এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়। এ রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ পৌঁছাবে। জেলে না পাঠিয়েও যে সংশোধন করানো যায় সেটার উদাহরণ সৃষ্টি হবে। আমি এ রায়ে খুশি। আমিসহ দুই আসামীর মা ও স্ত্রী লিখিত দিয়েছেন।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এটা যুগান্তকারি রায় হয়েছে। মামলায় আসামীদের দুই বছরের সাজা হতে পারতো। সেটা না করে তাদেরকে সংশোধনের যে রায় দেওয়া সেটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যে আইনে এ রায়টি দেওয়া হয়েছে সেটির প্রচলন নেই। আমারও এটা জানা ছিলো না। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে এমন দৃষ্টান্তমূলক রায় হয়েছে বলে জানা নেই।’

সংশোধনমূলক রায়ের আসামীরা হলো, আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের গুলখার গ্রামের মো. হারুণ বেপারির ছেলে মো. রায়হান বেপারি, হেলাল খানের ছেলে মো. আবুল কাশেম, আব্দুল আজিজের ছেলে ছেলে আনোয়ার হোসেন। রায়ের পর তাদেরকে জিম্মাদারের জিম্মায় দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে আখাউড়া থানায় মামলা হয়।

আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, প্রবেশনার আগামী এক বছরের জন্য প্রবেশন অফিসারের তত্ত্ববাবধানে থাকবেন এবং তার নির্দেশনাসমূহ মেনে চলবেন। ওই সময়ে তিনি কোন অপরাধ করবেন না, শান্তি বজায় রাখবেন, সদাচরণ করবেন। আদালত, প্রবেশন অফিসার  ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তলবমতে যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হবেন। তিনি মাদক সেবন ও বিক্রয় করতে পারবেন না। মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে মেলামেশা করবেন না। জুয়া, তাস, ক্যাসিনো, বাজি ইত্যাদি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। 

আসামী ধুমপান পরিত্যাগ করবেন। আসামীকে মাদক বিরোধী কার্যক্রমে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রবেশনকালীন সময়ে প্রবেশন কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এর নির্দেশনাক্রমে বিভিন্ন সভা সমাবেশে উপস্থিত হয়ে মাদক বিরোধী প্রচারনায় অংশগ্রহণ করবেন। প্রবেশন কর্মকর্তার অনুমতি না নিয়ে তিনি পেশা ও বাসস্থান পরিবর্তন করতে পারবেন না। সব সময় কোর্টের স্থানীয় অধিক্ষেত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট বাসস্থান বা পেশায় থাকতে হবে। প্রবেশনকালীন সময় আসামী পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হিসাবে ২০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপণ করবেন। তিনি সরকারী বা বেসরকারীভাবে যে কোন একটি কারিগরী ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন। আসামীরা প্রবেশন চলাকালীন সময়ে তার বৃদ্ধ পিতামাতার দেখাশুনা করবেন এবং ভরণপোষণের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন। সন্তানদের বিদ্যালয়ে প্রেরণ ও উপযুক্ত পড়াশোনার বন্দোবস্ত করবেন। নিয়মিত নামাজ আদায় এবং ধর্মীয় কাজ করবেন।

রায়ে আদেশ দেওয়া হয় যে, কোনো শর্ত লংঘন করলে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড ; অনাদায়ে আরো সাত দিনের  সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। প্রবেশন কর্মকর্তাকে প্রতি তিন মাস পরপর শর্ত প্রতিপালন ও অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট দাখিল করতে হবে। সফলভাবে প্রবেশনকাল সমাপ্ত হওয়া সাপেক্ষে প্রবেশনারকে মামলা থেকে চুড়ান্তভাবে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং ওই দণ্ড তার ভবিষ্যৎ জীবনের চাকুরিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনরুপ অনুপযুক্ততা বা প্রতিবন্ধকতা বলে গণ্য হবে না।


-Kalerkantho

Leave a Reply