সবাই যেন এখন বিচারকের আসনে |

মাঝে মধ্যে কিছু বন্ধু ও শুভ্রাকাঙ্খীরা টেলিফোন করে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, লেখালেখি বন্ধ করে দিলাম কেন? সমসাময়িক ইস্যুতে লেখাগুলো চালিয়ে যাও। আমার ‘সোজাসাফটা’ উত্তর কি হবে লেখালেখি করে? শত্রু বাড়িয়ে লাভ কী? বোবার কোনো শত্রু নেই।’ এক বন্ধুর উল্টো যুক্তি, ‘তোমার সত্য কথায় হয়ত একটি গোষ্ঠীর মনে আঘাত লাগে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম। বৃহৎ একটা গোষ্টির না বলা মনের কথা থাকে তোমার লেখায়। লেখালেখির জন্য শত্রু বাড়ে না, শত্রু তৈরি হয় ঈর্ষা থেকে।’ বললাম, কি জানি? তবে আমি মনে করি, আমার কোন শত্রু নেই। কারণ কারো উপকার করতে না পারলেও ক্ষতি করেছি, এমন নজির মনে নেই। মনের অজান্তে হলে হতে পারে। কাউকে ভালো না লাগলে তার সাথে চলি না। চলার পথে সকলের পাশে থাকার চেষ্টা করি। মানুষের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানোর সবোর্চ্চ চেষ্টা থাকে। মাঝে মধ্যে নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে, আমি কি শুধুই প্রয়োজন? নাকি প্রিয়জন? এলোমোলো ভাবনাগুলোর উত্তর মেলে না। আবার তেজপাতার সাথেও মনে হয় অনেক সময়। খাদ্যসামগ্রীর ঘ্রাণ বাড়ানো বা সুস্বাদু করতে তেজপাতা ব্যবহার করা হয়। তেজপাতা কখনো অন্য মসলার মতো পিষে দেওয়া হয় না। তেজপাতা তরকারি ও খাদ্যে পণ্যের মধ্যে দিয়ে ঘ্রাণ টুকু নিয়ে পরে তা পুরোপুরিই ফেলে দেওয়া হয়। এবারের বিষয়টি এসব এলোমোলো ভাবনা নিয়েই।

করোনাকালে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যাই না। পার্টি অফিসে বড় কোনো প্রোগ্রাম থাকলে যাই। না হলে আমার একমাত্র সন্তান নীরকেই সময় দেই। ওর সাথে খুনসুটি করে সময় কাটাই। মাঝে মধ্যে ফেসবুক চালাই। ফেসবুকে আর আগের মতো মজা পাই না। ফেসবুক খুললেই, হিংসা, বিদ্বেষ, চরিত্র হনন, আর চামবাজি দেখতে হয়। ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবী, পরজীবী, অনুজীবীদের নীতিবাক্য ও চর্বিত চর্বন দেখলে মনে হয়, সেই একমাত্র ধোয়া তুলসি পাতা; বাকীরা সমাজের জন্য বোঝা। আবার পেশাগত জীবনে ব্যর্থ, হতাশায় নিমজ্জিত, অন্যদিকে দাগি সন্ত্রাসী-নাশকতার মামলায় পলাতকরা বিদেশের মাটিতে বসে দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ, পেশাজীবীদের নিয়ে কুচিপূর্ন মিথ্যাচার করেই চলেছেন। সেসবও দেখতে হয়। শুধু কী তাই? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যাচার-অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সরকার, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও।

সেদিন ফেসবুকে চোখ বুলাতে গিয়ে একজনের ওয়ালে চোখ আটকে গেল। বিষয়টি বেশ মজারই মনে হয়েছে। বিষয়টি আপনার জন্য তুলে ধরছি। ‘বাংলাদেশের জাতীয় খেলা ‘কাবাডি’র একটি ছবি দিয়ে একজন ফেসবুকে পোস্ট করেছেন ‘কাবাডি কেন জাতীয় খেলা’। ছবির ক্যাপসনে লেখা আছে, ‘এক বিদেশী লোক আমাদের দেশের ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই এত খেলা থাকতে কাবাডি কেন তোমাদের জাতীয় খেলা হলো? ছাত্রটি বলে, কাবাডি খেলার একটি নিয়ম হচ্ছে, কেউ যখন লক্ষে পৌছেতে চায়, বাকীরা সবাই টেনে হিচরে তাকে নীচে নামিয়ে ফেলে যাতে সে ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের এমন স্বভাব। তাই কাবাডি আমাদের জাতীয় খেলা।’

এটা স্রেফ বিনোদনমূলক হলেও বাস্তবতায় অনেক মিল আছে। কারণ দলাদলিতে বাঙালিদের আগে কেউ নেই। বাঙালির অনেকেই পরনিন্দা, পরচর্চায় ব্যস্ত থাকেন। ঈর্ষাকাতর। একজন ভালো করলে, অন্যজনের ভালো লাগে না। কিভাবে অন্যকে টেনে ধরা যায়, সে চেষ্টায় সবাই ব্যস্ত থাকেন। বাঙালির অতি প্রিয় টাইমপাস। সেখানে কে কার মাসি আর কে কার পিসি বলা মুশকিল। জুকারবার্গে মহা আবিস্কার ফেসবুকে চোখ বুলালেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এখন যতটা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তার চেয়ে নেতিবাচকই বেশি। অপপ্রয়োগ করে নারী-শিশুদের হয়রানিসহ সমাজে হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আমার এক বন্ধু সরকারি কর্মকর্তা। সেদিন রাতে ফোন করলেন। ফোন ধরতেই বললেন, ‘দোস্ত তোরা এত খারাপ কেন? বললাম- কে তোকে বাঁশ দিল? সে অভিযোগ করার জন্য এত রাতে ফোন করেছিস? বললেন, না দোস্ত, তোর সাথে কথাও হয় না, তাই খোঁজখবর নিতে ফোন করলাম। দীর্ঘক্ষণ ফোনালাপ হলো। তার কথার সারমর্ম হলো, সাংবাদিকরা সবচেয়ে খারাপ! অহেতুক একজনের বিরুদ্ধে লাগে। তাকে বললাম নচিকেতার গানটি মনে নেই? দু লাইন গেয়ে শোনালাম —- আজকে যিনি দক্ষিনে তো, কালকে তিনি বামের। আজকের যিনি তেরঙ্গাতে কালকে ভক্ত রামের। কে যখন কার পেছনে তে বুঝি না কে ঘাঁটি। আসলে সবাই সবার পেছনেতে সবার হাতেই কাঠি। কথায় কথায় ধর্মঘাট সবাই ধর্মঘটি। অধার্মিকের ধর্মঘাটে আর স্লোগানে আমার হারিয়ে গেছে ঘটি। সে বলল, কাক কাকের মাংস না খেলেও সাংবাদিকরা তা করে। আমিও চুপচাপ শুনলাম তার কড়া যুক্তিগুলো। তার কথার সঙ্গে পুরোপুরি সায় না দিলেও পরে মনে মনে ভাবলাম, আজ একজন দামী একটা শার্ট পড়লে, আরেকজন আড় চোখে তাঁকাবে। ভাবতে-এটা টাকা দিয়ে কেনা নয়। হয়ত কেউ গিফট দিয়েছে। একটা দামি গাড়ী কিনলে বলবে, ধান্ধা করে গাড়ীর টাকা জোগার করেছে। আর একটা ফ্ল্যাট যদি কিনে ফেলে তাহলে তো মহা অন্যায় করেছে। কারণ সাংবাদিকরা কেন বাড়ী-গাড়ীর মালিক হবে? এমন ভাবখানা কারো কারো মধ্যে আছে। এসব কথা ভাবতে গিয়ে সেই ‘পুকুরে মুসল্লী ও চোরের গোসল’র কথাই মনে পড়ল। যে  যেমন সে অন্যকেও তেমনই ভাবে। অথাৎ চোর অন্যকে চোর, আর মুসল্লী অন্যকে মুসল্লীই ভাবে। এটাই বাস্তব সত্য।

সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ও সাংবাকিতা পেশা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম নোংরামি চলছে। যারা এমন নোংরামিতে নেমেছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, কেন এত চুলকানি ভাই? সাংবাদিক মানেই কী কাঁধে একটা ঝোলা, পায়ে ছেড়া স্যান্ডেল নিয়ে ঘুরবে? আরে ভাই, যুগ বদলাইছে। এখন জায়গায় বসে সংবাদ আপ করা যায়। বিভিন্ন পাবলিক বিদ্যালয় থেকে সবোর্চ্চ ডিগ্রীধারীরা এ পেশায় নিয়োজিত। অনেকেই বিএসএস দিয়ে সরকারি চাকরি করতে পারতেন। কিন্তু মহান পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আবার ডাক্তারি পেশা ছেড়ে সাংবাদিকতা করছেন এমন নজিরও আছে। তরুণ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হাসিব ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে এখন সাংবাদিকতা পেশায়। জনপ্রিয় উপস্থাপক মহিউদ্দিন ভাই বিএসএস দিয়ে সরকারি চাকরি পান। কিন্তু বেশি দিন চাকরি করেননি। সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছেন। আবার অনেকে পেশা ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন এ সংখ্যাও কম নয়। সম্প্রতি আমরা কী দেখলাম? দেশ-বিদেশে বসে দেশের জনপ্রিয় সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন এমন বিভিন্ন পেশার ছেলেমেয়েদেরকে টার্গেট করে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। অপরাধ তারা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রশ্নে আপোষহীন এবং তাঁর সরকারের সাফল্যগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এই অপপ্রচারকারী কারা? বিশ্লেষণ করলেই পরিস্কার হয়ে যাবে। কারো কারো বাবা-দাদা সরাসরি জামাতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আবার কেউ ছাত্রজীবনে শিবির-ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। আবার কেউ কেউ সাংবাদিকতায় এসে প্রথমে ঝলকানি দিয়ে উঠলেও ফানুসের মতো তা চুপসে গেছে ক্ষনিকেই। নারী কেলেঙ্কারীতে চাকরিচ্যুতও হয়েছেন। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে গলাধাক্কা দিয়েও বের হতে হয়েছে। আবারও কারো কারো দীর্ঘদিন অবসরে বুদ্ধি মাথার ভেতরে কিলবিল করে। হাতে প্রচুর সময়। তাই ফেসবুকে বিনামূল্যে জ্ঞান বিতরণের কারখানা খুলেছেন। এসব ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবী, পরজীবী, অনুজীবীরা কাউকে ছাড় দেয় না। সাংবাদিকতার বাতিঘরখ্যাত শ্রদ্ধেয় মরহুম সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার ভাইকেও বির্তকিত করতে ছাড়েনি। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শীর্ষ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম ও নির্বাহী সম্পাদক কলামিস্ট পীর হাবিবুর রহমানকেও নিয়ে সীমাহীন মিথ্যাচার করেছে। আরে ভাই একজন নঈম নিজাম একদিনে সৃষ্টি হয়নি। জুনিয়র রিপোর্টার থেকে দেশের শীর্ষ দৈনিকের সম্পাদক। এখানে আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। একটি পত্রিকার দীর্ঘ একযুগ টানা সাফল্য ধরে রাখাও চাট্টিখানি কথা নয়। নঈম নিজাম ও পীর হাবিবুর রহমানের কলামের জন্য লাখ লাখ পাঠক অপেক্ষা করেন। এখানেই শেষ নয় জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক কালের কন্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ভাইকেও রেহাই দেয়নি এই ফেসবুকজীবীরা। যার অমর সৃষ্টি “নূরজাহান”। এর মাধ্যমেই সারাজীবন পাঠকের মনে বেঁচে থাকবেন। আজকে যারা তাদের নিয়ে মিথ্যাচার করছেন, তাদের অনেককে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। এদের অনেকেই হয়ত চাকরির জন্য এসে পাননি, অথবা এক সঙ্গে কাজ শুরু করলেও তাদের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেননি। এটাই মূল কারণ। এটা তাদের দোষ নয়, আপনাদের ব্যর্থতা।

যখন মন খুব খারাপ হয়, তখন গান শুনি। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের একটা গান শুনলাম, খুব লাগল। গানটির অংশবিশেষ তুলে ধরছি, ‘আমায় দেখে জ্বলছে যারা, তাদের চাইছি বলতে পিএনপিসি না করে তোদের চরকতায় তেল দে। যাদের ভাবি বড্ড কাছের আমার আপনজন, তারাই আবার করছে কাঠি, সামনে প্রিয়জন। যতই করুক হিংসা তোরা, আমি বড়ই বেপরোয়া, ভয়ডর করি না, তোদের জ্বলবেই আমার কাজও চলবে।’ ফেসবুকীয় পরজীবী, অনুজীবীদের উৎসর্গ করছি, গানটি। আপনারা জ্বলতে থাকুন, যে যার কাজ তা করবেই।

সেদিন সাবেক ছাত্রনেতা ফুয়াদ বিন জামানের সাথে কথা হচ্ছিল ফেসবুকের এমন মিথ্যাচার নিয়ে। সে বলল, এখন অনেকেই বেকার। হাতে প্রচুর সময়। তাই কিছু তো করতে হবে। অন্যের ভালো দেখলেই কিছু মানুষের চুলকায়। কেউ কেউ হুজুগে চলে। কেউ কেউ বিচারকের আসনে বসে যান। ঘটনার আগে পরে না জেনেই পারলে কাউকে কাউকে ফাঁসি দিয়ে দেন। নীতিহীনরাই বড় বড় নীতি বাক্য বলে বেড়ায়।
লেখক: সাংবাদিক


-Kalerkantho