আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই শতকে জনপ্রশাসন |

পৃথিবীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ষাটের দশকের দিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া শুরু হয়। পাঁচ দশক পর বিভিন্ন দেশ উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পাঁচ দশক পর উন্নয়নের একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ছোট্ট ভূখণ্ডে বিপুল জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রথমেই বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য একটি ‘উদাহরণ’ হয়ে উঠেছে। এর পেছনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিমালা, কৌশল ও কার্যক্রমের অবদান অনস্বীকার্য। নিয়ামক হিসেবে দেশের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো কার্যক্রম, সেটা উন্নয়ন কার্যক্রম বলুন বা অন্য যেকোনো আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডই বলুন—সেগুলো পরিচালনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ এখন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক সন্ধিক্ষণে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক যেমন স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নাগরিক অধিকার—এগুলোরও সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে হবে। এ পর্যন্ত উন্নয়নের মূল কৌশল ছিল প্রবৃদ্ধির দ্রুত বৃদ্ধি। এর ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে আয়ের বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এটাই আমাদের একটি মূল চ্যালেঞ্জ। ইদানীং কভিড-১৯ এসেছে আরেকটি বিরাট চ্যালেঞ্জ নিয়ে। এই মহামারির ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশাল একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে গেছে অর্থাৎ নব দরিদ্রের সৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সার্বিক ও সমন্বিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রয়াস। চারটি প্রধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তোষজনক ও স্থায়ী সমাধান করা যেতে পারে : ক. আপামর জনসাধারণ, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনা; খ. উন্নয়নের, বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির সুফলের ওপর দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা, যাতে অন্যায়ভাবে তাদের বঞ্চিত না করা হয়; গ. প্রশাসন ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; ঘ. গণমুখী জনপ্রশাসন নিশ্চিত করা। এই নিবন্ধে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে চতুর্থ বিষয়টি।

প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে গণমুখী জনপ্রশাসনের বৈশিষ্ট্য কী? এটা হবে প্রথমত. জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন; দ্বিতীয়ত, এটা হবে দক্ষ প্রশাসন; তৃতীয়ত, সততা, নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলাবোধ থাকতে হবে; চতুর্থতে প্রশাসককে পরার্থপরতার অনুসারী ও জনগণের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। এই চারটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হলে জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হতে হবে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, কর্মসম্পাদনে দক্ষ। কিন্তু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা, যেটা আমরা বলি শুধু ‘হার্ড স্কিল’ আহরণ করা যায়; বাকি বৈশিষ্ট্যগুলো আহরণ করতে হবে যেটা আমরা বলি ‘সফট স্কিল’-এর মাধ্যমে। এই সফট স্কিল ও বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত মানুষ আহরণ করে আলোচনা, একের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগ, দলভিত্তিক কাজ, বিভিন্ন উদাহরণ ও কেস স্টাডি ইত্যাদির মাধ্যমে; যেটা চলমান এবং সাধারণত অনেকটা অনানুষ্ঠানিক। অনেক সময় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উপদেশ, অভিজ্ঞতা জানা এবং তাঁদের কর্মপদ্ধতির মাধ্যমেও এটা আহরণ করা যায়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখে থাকি, জনপ্রশাসন, বিশেষ করে সরকারি কর্মক্ষেত্রে ‘সফট স্কিল’-এর বিষয়ে গুরুত্ব ও আগ্রহ অপেক্ষাকৃত কম। অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, যা অনেকাংশে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে দেওয়া হয়; সেটারই প্রাধান্য বেশি থাকে।

উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মানুষ ও সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় : ক. প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (সিস্টেম); খ. সবার অংশগ্রহণের জন্য সঠিক প্রক্রিয়া (প্রসেস); গ. সক্রিয় ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ প্রশাসনের ব্যক্তি, সুধীসমাজের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তি খাতের ব্যক্তি। এই তিনটি বিষয় ও ওপরে উল্লিখিত চারটি বৈশিষ্ট্য মিলেই হবে ‘গণমুখী জনপ্রশাসন’।

kalerkanthoভূমিকা ও ওপরে আলোচিত জনপ্রশাসনের বিভিন্ন দিকের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এই শতকের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—কোনো রাষ্ট্রই একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো চলতে পারবে না। বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির প্রভাব সব রাষ্ট্রের ওপর পড়েছে। তদুপরি যোগ হয়েছে সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের তাগিদ, কাঠামোগত সংস্কার ও বাজার অর্থনীতির প্রয়োজনীয় নিয়ামকসমূহ এবং অবাধ তথ্য ও নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা। বর্তমান কভিড-১৯ মহামারির আঘাতের ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক মিলিয়ে রাষ্ট্রের সব খাতেই স্থবিরতা চলে এসেছে। জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করে মহামারি প্রতিহত করার চেষ্টায় সবাই ব্যস্ত ও উৎকণ্ঠিত। মোটা দাগে আরো তিনটি বিষয় দক্ষ ও গণমুখী প্রশাসনে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। সেগুলো হলো—ক. নিম্নমধ্যম আয় থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া; খ. উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য হওয়া এবং পরবর্তী পর্যায়ে উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়া; গ. টেকসই উন্নয়ন অর্থাৎ জাতিসংঘের ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস-২০৩০-এর মধ্যে অর্জন করা।

ওপরের আলোচনার মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট যে বাংলাদেশকে বর্তমান অবস্থা থেকে আরো উন্নত পর্যায়ে নেওয়া এবং সব অনিশ্চয়তা ও দুর্বলতা কাটিয়ে ভবিষ্যতে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রীয় জনপ্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে আমি অন্যান্য খাতের প্রশাসন সম্পর্কে আলোচনা না করে শুধু রাষ্ট্রীয় জনপ্রশাসনকে গণমুখী জনপ্রশাসন করার জন্য সাতটি পদক্ষেপ উল্লেখ করব। সেগুলো হলো—ক. প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ : কেন্দ্র থেকে devolution, deconcentration ও delegation-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভৌগোলিক স্তরে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন; খ. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালীকরণ। সংবিধানের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রশাসন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ উন্নয়ন, নাগরিক সুরক্ষাসহ মানুষের জীবনের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ; গ. জনপ্রশাসনকে জবাবদিহিমূলককরণ। তিনটি বিশেষ দিক প্রয়োজন—স্বচ্ছতা (transparency); বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের শুনানি (public hearing of issues and policies); ঘ. প্রশাসককে সমাজচেতনায় উদ্বুদ্ধ বিশেষ নাগরিকের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন; সর্বোপরি নীতিনির্ধারণ কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধির সার্বিক পরামর্শে গুরুত্ব দেওয়া। তবে উল্লেখ্য, জনপ্রশাসনের সব ব্যক্তিকেই রাজনৈতিক দলের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে; ঙ. জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি; দক্ষ প্রশাসকের কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি করলে জনসাধারণ সহজেই বিভিন্ন সেবা পাবে; চ. জনপ্রশাসনের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবাধ তথ্য প্রদান। প্রশাসন সম্পর্কে গোপনীয়তা কমিয়ে এনে জনগণকে নিয়মিত ও সঠিক তথ্য অবহিত করতে হবে; ছ. নিয়মনীতির প্রাধান্য থাকবে, আমলাদের বিশেষ ক্ষমতা (discretionary power)-এর ব্যবহার যেন খুব কম হয়। এতে প্রশাসনে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা অনেক হ্রাস পাবে।

এই নিবন্ধে বর্তমান উদ্ভূত মৌলিক বিষয়ের ওপর ধারণা দেওয়া হয়েছে, যেটা জনপ্রশাসনকে বাংলাদেশের সম্মুখপানে যাত্রা দ্রুততর করবে এবং বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়


-Kalerkantho