রাজ্যহারা রাজা রোনালদো |

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর প্রয়োজন কি তবে ফুরিয়ে গেল পর্তুগাল দলে? এমন দিন দূরতম কল্পনাতেও ছিল না কারোর। বিশ্বকাপের মাঠে পর্তুগালের জাতীয় সংগীত তিনি গাইছেন ডাগআউটে! হতাশা রোনালদোকে কতটুকু গ্রাস করেছিল, বলা মুশকিল। তবে ক্ষণে ক্ষণে প্যান করা ক্যামেরায় যে রোনালদোর ছবি দেখা যাচ্ছিল জায়ান্ট স্ক্রিনে, সেটিকে বিষণ্নতার অভিব্যক্তি বলে চালিয়ে দিতে পারেন যে কেউ। ভক্তরাও কম চমকে যাননি।

বিজ্ঞাপন

যথারীতি গ্যালারিতে রোনালদোর জার্সি নম্বরই বেশি। সেই ভক্তরাও নেচেগেয়ে মাঠ ছেড়েছেন। রোনালদোর অভাব যে ততক্ষণে হ্যাটট্রিক করে ভুলিয়ে দিয়েছেন গনসালো রামোস নামের এক তরুণ। পর্তুগালের জার্সিতে রামোসের অভিষেক হয়েছিল আগে, তিন ম্যাচ খেলেছিলেন বদলি হয়ে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পরশু একাদশে প্রথম সুযোগ পাওয়া এই তরুণের গোল বিস্ফোরণ দেখে সবাই হতবাক। রোনালদো ভক্তরাও উদ্বেলিত। মানুষ এমনই, নতুনকে সহজে কেউ আলিঙ্গন করতে চায় না। যাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেম, যাঁর খেলা-গোল দেখে বেড়ে ওঠা, তাঁকে কি সহজে ছাড়া যায়। ফুটবলানুরাগীরা গত দুটি দশক কাটিয়েছে মেসি-রোনালদোর সঙ্গে। প্রতি সপ্তাহে তাঁদের ফুটবল বিনোদন উপভোগ করে। হঠাৎ করে একজনকে ছাড়তে বললেই তো আর ছাড়া যায় না।

তা ছাড়া পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীর জায়গায় নামা গনসালো রামোসও এভাবে জ্বলে উঠবেন, সেটাই বা কে ভেবেছিল। পর্তুগিজ কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের প্রত্যাশাকেও নিশ্চিতভাবে ছাড়িয়ে গেছেন রামোস। তবু ম্যাচ শেষে রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা নিয়ে প্রশ্ন গেছে পর্তুগিজ কোচের কাছে। তিনি উত্তরও দিয়েছেন, তবে সংক্ষেপে, ‘এটা ছিল ম্যাচের কৌশল। গনসালো দারুণ খেলোয়াড়, সুইজারল্যান্ডের ম্যাচে ওকে দরকার ছিল। ’ অবশ্য কোচের সঙ্গে রোনালদোর খটমট শুরু হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে। ৬৫ মিনিটে মাঠ থেকে তুলে নেওয়াটা তাঁর মনঃপূত হয়নি। রেগেমেগে পর্তুগিজ অধিনায়ক তর্কে জড়ান এক কোরিয়ানের সঙ্গে। পরে মাঠ ছাড়তে ছাড়তে কোচের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে তুলে নিতে তর সইছে না কোচের। ’ তবে সান্তোস দাবি করেন, ‘আমার আর অধিনায়কের মধ্যে কোনো ঝামেলা নেই। আমরা বহু বছরের বন্ধু। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো একজন পেশাদার খেলোয়াড় এবং সে অধিনায়ক হিসেবে দারুণ উদাহরণ তৈরি করেছে। ’

পর্তুগিজ কোচ যত প্রশংসাই করুক, রোনালদো কখনো নিজেকে বেঞ্চের ফুটবলার হিসেবে দেখতে চান না। সহজভাবে নিতেও পারেন না। তাই সুইসদের জালে গনসালো রামোসের চমৎকার প্রথম গোল দেখে তাঁর কোনো হেলদোল হয়নি। অধিনায়ক হিসেবে একটু হাততালিও দেননি। পরের গোলে তাঁর মুখে ফিরেছে স্মিত হাসি। তৃতীয় গোলে সেটা মিশে যায় বিস্ময়ের মোহনায়। দুর্ভাগ্য এমনই যে পরে রামোসের বদলি হয়ে নেমে ৩৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড একবার বল জালে জড়ালেও তা বাতিল হয়ে যায় অফসাইডের কারণে। তখন হাহাকার ওঠে পুরো স্টেডিয়ামে। এই ম্যাচটাই যেন অস্ফুটে বলে দিয়ে গেছে, পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসের সেরা তারকার দিন বুঝি ফুরিয়ে গেছে। দেড় দশকের রাজত্ব রোনালদোকে হয়তো ছাড়তেই হবে।

সুইজারল্যান্ড ম্যাচের আগে সর্বশেষ ২০০৪ ইউরোতে রাশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো ছিলেন বেঞ্চে। ১৮ বছর পর কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে তিনি শুরু থেকে দর্শক।

রোনালদোর গোলে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে রচনা হয়েছে কত কীর্তি। লিওনেল মেসির সঙ্গে গোলের লড়াই করে পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। কত শিরোপা উপহার দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদকে। ইউরোপ সেরা করেছেন পর্তুগালকে। ১১৮ গোল করে পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হঠাৎ করে দেখছেন দলে তাঁর জায়গা নেই। হঠাৎ রাজ্য হারানো রাজার যা হয়, ঠিক তা-ই হয়েছে রোনালদোর। রাজা বুড়িয়ে গেছেন, আগের সেই আকর্ষণও নেই। বয়স তাঁর ফুটবল যৌবন কেড়ে নিয়েছে। তিনি এখন আর দশজনের মতোই। ঠিক এ কারণে রোনালদোর সঙ্গে লেগেছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ টেন হাগের। ক্লাব দলেও বেঞ্চে চলে গিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বকাপের মধ্যেই রটেছিল সৌদি আবরের আল নাসর ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করেছেন রোনালদো। কিন্তু সুইজারল্যান্ড ম্যাচের পর সেই খবর নাকচ করে দিয়েছেন রোনালদো। জাতীয় দলে অবশ্যম্ভাবী নন। নির্দিষ্ট ক্লাব-ঘরও নেই। অথচ ফোর্বসের জরিপ বলছে, ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ‘সিআরসেভেন’ ব্র্যান্ডের দাম এখনো সবচেয়ে বেশি। গ্যালারিতেও প্রধান আকর্ষণ তিনি। রোনালদো যেন সেই রাজা, যাঁর রাজ্যটাই শুধু নেই!


-Kalerkantho