রাজনীতি কি অনিবার্য সংঘাতের দিকে যাচ্ছে |

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষকে সামাজিক ও যুক্তিবাদী দুই বৈশিষ্ট্যে অভিহিত করেছিলেন। বাস্তবে যা সত্য বলে দেখা যায়, বোঝা যায় তাকে মেনে নেওয়াই যুক্তির মূলকথা। এর মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের আস্থা, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়। দলবদ্ধ সমাজ তাতে প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সুযোগ পায়।

বিজ্ঞাপন

মানবসভ্যতা এভাবেই অগ্রগতির দিকে ধাবিত হয়েছে এবং হতে পারে। মানুষ যে বুদ্ধিমান সামাজিক শক্তি এটিই তার পরিচয়। প্রাচীন যুগের জ্ঞানীগুণী দার্শনিকরা যে শিক্ষা মানুষের সম্মুখে উন্মোচন করেছেন সেটি ইতিহাসের পথ ধরে আরো বিকশিত হয়ে এসেছে। এখন মানবসভ্যতা উন্নতি, অগ্রগতির যে উচ্চস্তরে আরোহণ করেছে বা করতে যাচ্ছে তার মূলে রয়েছে মানুষের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, যুক্তির পথ ধরে হাঁটা এবং অতীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবজীবন অতিক্রম করে সম্মুখের দিকে অধিকতর আলোর পথে চলার গতি লাভ করা। অতীতে যেসব জনগোষ্ঠী যুক্তি, বুদ্ধি এবং ন্যায়কে বুঝতে দেরি করেছে সেসব জনগোষ্ঠী নানা দ্বন্দ্ব, সংঘাত, যুদ্ধবিগ্রহেই শুধু জড়ায়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি ধ্বংসও হয়ে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে মানবসভ্যতার বিকাশ তাই অতীতে কোথাও মসৃণ ছিল না।

যুক্তির সংস্কৃতির ধার যিনি বা যাঁরা ধারেন না তাঁরা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য কোনো মঙ্গল, কল্যাণ অথবা অগ্রগতি সাধন করতে পারেন না। এই শিক্ষাটি এখন আমরা জানি না বা বুঝি না তা বলা যাবে না। কারণ আমরা এখন বসবাস করছি আধুনিক যুগে, যখন বিশ্ব মানুষের একেবারেই জানা ও বোঝার নাগালের মধ্যে অবস্থান করছে। কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো, এমন এক উন্মুক্ত পৃথিবীতে বসবাস করেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দেশে দেশে পশ্চাৎপদ মতাদর্শ, ভাবাদর্শ, রাজনীতি, স্বার্থের মোহে সব কিছুকে সংঘাতের মুখে ঠেলে দিতে তৎপর থাকে, তখন সমাজের অগ্রসর, দায়িত্বশীল, প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী অংশকে ইতিহাসের গতিময়তা রক্ষার্থে যথাযথ ভূমিকা পালন করতেই হয়। সে কারণেই বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের বিকাশ, উন্নতি আপনাআপনি হয় না, পশ্চাৎপদ, যুক্তিহীন, প্রতিক্রিয়াশীল অংশকে নিরস্ত্র ও পরাস্ত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে এগিয়ে নিতেই হবে। অন্যদিকে পশ্চাৎপদ শিক্ষা, সংস্কৃতির ভেতর থেকেই জন্ম নিতে থাকবে যুক্তি, বিবেক এবং আদর্শের চিন্তা, যা রাষ্ট্র ও সমাজকে রাজনৈতিকভাবে অধিকতর উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আমরা ইতিহাসের এমন এক যুগসন্ধিক্ষণ এখন অতিক্রম করছি, যখন এখানে বুদ্ধি, দেশপ্রেম, জনগণের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার মূল্যবোধ প্রাধান্য পাবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই চৈতন্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটিই বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার অধিকারেই মানুষের শিক্ষণীয় পথ।

আগামী ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে একটি টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই উত্তেজনা আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য প্রথম বা নতুন নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের আগে থেকেই নানা উত্তেজনা, অযৌক্তিক, অমানবিক শক্তির প্রয়োগ ঘটেছিল মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করার জন্য। পাকিস্তানি সামরিক শক্তি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা সংঘটিত করে। প্রতিক্রিয়ায় জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল এক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু যারা জাতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তারা বিবেক-বুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করেনি। দেশপ্রেম তাদের স্পর্শ করতে পারেনি।

সাড়ে সাত কোটি নিরস্ত্র মানুষ সদ্যঃস্বাধীন দেশে শান্তিতে বসবাস করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছিল। কিন্তু যুক্তিহীন, আদর্শহীন, বিবেকবর্জিত গোষ্ঠী বেআইনিভাবে ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটায়। বাংলাদেশ স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিকাশের পথ লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের যে জায়গা তৈরি হয় তাতে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক অপশক্তিরও উত্থান, অবস্থান ক্রমবর্ধমানভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে পেরেছে। অন্যদিকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ যতবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে ততবারই বিরুদ্ধ শক্তি তাকে প্রতিহত, উত্খাত কিংবা উচ্ছেদ করার এক হীন ষড়যন্ত্রের প্রকাশ ঘটাতে চেষ্টা করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের বনাম মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী শক্তির দ্বন্দ্বের এক সাংঘর্ষিক রূপের অবস্থান ঘটেছে। রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী এই দুই শক্তির অবস্থান আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাত্র সাড়ে ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রতিপক্ষ প্রায় ২৯ বছর ক্ষমতায় থাকলেও বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক এবং গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শের উন্নয়নে উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি। কিন্তু রাজনীতির এই বাস্তবতাকে যুক্তিসংগতভাবে বোঝা এবং আধুনিক রাজনীতিকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক শক্তি এখনো সব কিছু ফিরে দেখার বা পুনর্মূল্যায়ন করার উপলব্ধিতে আসেনি। ফলে পরস্পরবিরোধী দুই রাজনীতির শক্তি বাংলাদেশে মুখোমুখি অবস্থান করছে, যা আধুনিক যুগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান হলেও রাজনীতির সংস্কৃতিচর্চার অভাবের কারণে এর অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত অবস্থান রাজনীতিতে প্রায়ই আমাদের দেখতে হচ্ছে। ২০১৫ সালের পর আশা করা গিয়েছিল যে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাবে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার তেমন কোনো ইতিবাচক লক্ষণ পরস্ফুিট হয়নি। এরই মধ্যে বৈশ্বিক করোনা সংকট এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে টালমাটাল অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বের সব কটি দেশকেই প্রায় একটি অচলাবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশ অনেক সূচকে অগ্রগতি লাভ করলেও এসব ধাক্কায় কিছুটা বিপর্যয় বোধ করছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে সমঝোতাপূর্ণ হওয়া দরকার ছিল সেখানে পরস্পরবিরোধী মেরুকরণে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তার পরও দুই মেরুতে অবস্থানকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যার যার কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া এবং বাংলাদেশকে বর্তমান বৈশ্বিক সংকট থেকে বের করে আনার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়াই ছিল বাঞ্ছনীয় এবং যুক্তিসংগত পথ।

ধারণা করা হয়েছিল বিএনপি অনেক দিন পর যে বিভাগীয় দলীয় সভাগুলো শেষ করে ঢাকায় একটি সমাপ্তিমূলক সভা অনুষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছিল সেটি থাকবে পরিচ্ছন্ন ও যুক্তিসংগত কর্মসূচির ঘোষণার আয়োজনে। কিন্তু শুরু থেকেই ১০ ডিসেম্বরকে একটি ব্যতিক্রমধর্মী রূপ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকার পতন এবং ক্ষমতা দখলের কথাও উচ্চারিত হচ্ছিল। নেতাকর্মী-সমর্থকদেরও ওই ধরনের ধারণা দেওয়া হচ্ছিল। ঢাকায় সমাবেশটি অনুষ্ঠানের স্থান নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্য বেশ সন্দেহের জন্ম দেয়। দলীয় অফিস নয়াপল্টনের সম্মুখে সভা করার ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান বারবার প্রকাশ করা হতে থাকে। অথচ জায়গাটি রাজধানীর অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি সড়ক এবং আবাসিক ও নানা স্থাপনার অভ্যন্তরে, যা কোনো জনসভার জন্য মোটেও নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। বিভাগীয় সমাবেশগুলোর পর পরিসমাপ্তির সভা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল মাঠেই একটি পরিচ্ছন্ন জনসভার আয়োজনের যৌক্তিকতা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। ডিএমপিও সেখানেই তাদের জনসভা করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বিএনপি সেখানে কোনো অবস্থায়ই জনসভা না করার ঘোষণা দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা সন্দেহ, জল্পনা-কল্পনার ডালপালা মেলতে থাকে।

১০ তারিখে শান্তিপূর্ণ একটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপি যদি দেশের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো কর্মসূচি, পরিকল্পনাসহ আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যৌক্তিক কর্মসূচি ঘোষণা করত, তাহলে দেশের রাজনীতিতে সুবাতাস বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যেত। কিন্তু একটি জনসভাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা, প্রচার, অপপ্রচার, সন্দেহ, গাড়ি পোড়ানোর আশঙ্কাসহ নানা ধরনের কথা ও পরস্পরবিরোধী অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, তা দেশের রাজনীতিতে সংঘাতময় মনোবৃত্তির ধারাবাহিকতাকে আরো যেন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে কারোরই লাভের কোনো আশা করা যায় না। এটি যুক্তিহীন, বিবেকহীন এবং বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় অগ্রহণযোগ্য একটি দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় রাজনীতির নামান্তর ছাড়া আর কিছু নয়।  

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়


-Kalerkantho