জোট সরকার নিয়ে স্থিতিশীলতার মিশনে প্রচণ্ড |

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারীর কাছে শপথবাক্য পড়েন নতুন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ড। সূত্র: এএফপি

রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর নেপালে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ডর নেতৃত্বে নবগঠিত জোট সরকারের শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য, আদর্শহীনতা এবং দেশটির রাজনীতিতে অতীতের তিক্ততা এই সরকারের ভবিষ্যত্ নিয়ে সন্দিহান করে তুলছে পর্যবেক্ষকদের।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (সিপিএন) অন্যতম উপদল মাওবাদী কেন্দ্রের (এমসি) চেয়ারম্যান পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ডর সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না। আদর্শহীনতা, বিপরীত আদর্শের দলের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং চরম সুবিধাবাদী নীতিই এর জন্য দায়ী হবে।

বিজ্ঞাপন

এখন পর্যন্ত বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সাতটি দলের সমর্থন নিয়ে ১৬৩ জন আইন প্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত করতে পেরেছে। দলগুলো এরই মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

নেপালের ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম নেপালি টাইমসের সংবাদকর্মী সান্তা গাহা মাগার তাঁর এক নিবন্ধে লেখেন, আদর্শ এবং জনগণের মুক্তির জন্য ১০ বছরের সংগ্রামকে ভুলে গিয়ে প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন। তিনি আরো লিখেছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ড, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ থাকছে অলির হাতেই।

নবগঠিত জোট সরকারের যোগ দিয়েছে রবি লামিচানের নেতৃত্বাধীন নতুন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। নির্বাচনের আগে তারা ভোটারদের কাছে পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে ভোট আদায় করেছে। কিন্তু প্রচণ্ডর চরম সুবিধাবাদী সরকারের অংশ হয়ে সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে সন্দিহান পর্যবেক্ষকরা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই জোটের অংশ হয়েছে হিন্দুত্ববাদী রাজতন্ত্রপন্থী রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (আরপিপি)। বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন জোটে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়াবে।

গত ২০ নভেম্বর নেপালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয়। নেপালের আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ২৭৫টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৯টিতে জয়লাভ করে নেপালি কংগ্রেস। সদ্যোবিদায়ি প্রধানমন্ত্রী ও দলটির নেতা শের বাহাদুর দেউবার সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে মতানৈক্য হওয়ায় পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ড জোট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খগেন্দ্র প্রসাদ (কেপি) শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ মাওবাদী লেনিনবাদী (সিপিএন-ইউএমএল) উপদলের সমর্থনে সরকার গড়লেন প্রচণ্ড। সর্বশেষ নির্বাচনে এই কমিউনিস্ট উপদলটি ৭৮টি আসনে জয়লাভ করে দ্বিতীয় হয় এবং প্রচণ্ডর উপদলটি ৩২টি আসন নিয়ে তৃতীয় হয়। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ২০১৭ সালে অলিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রাখা প্রচণ্ড এবার অলির সমর্থনেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রচণ্ডর পর বাকি অর্ধেক মেয়াদে অলির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা। দেখার বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতার বাকি অর্ধে প্রচণ্ড প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সমর্থন অব্যাহত রাখেন কি না। ২০১৭ সালে অলিকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রচণ্ড বলেছিলেন, অলির সঙ্গে মিত্রতার চেয়ে তিনি ‘বিষপান’ করবেন।

এদিকে সরকার গঠনের পর থেকে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে বেশ তত্পর দেখা যাচ্ছে দলগুলোকে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটিই ইঙ্গিত দেয় যে আগামী পাঁচ বছর পথচলা বেশ কঠিন হবে। মর্যাদাপূর্ণ ৩৫টি সাংবিধানিক পদ ভাগ করে নেওয়া প্রায় নিশ্চিত। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, আইনসভার স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সাতটি প্রদেশের প্রাদেশিক প্রধানের পদ। জোট সরকারের সবচেয়ে বড় অংশীদার হিসেবে সিপিএন-ইউএমএল প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার স্পিকার পদ পাচ্ছে।

ইউএমএল নেতা পৃথ্বি শুভ গুরুং বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পদটি আমাদের দলের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি হবে। প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার পদে মাওবাদী কেন্দ্রের সঙ্গে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবে। ’ অর্থাত্ সরকারপ্রধান পরিবর্তন হলে স্পিকার পদেও পরিবর্তন আসবে। সূত্র : নেপালি টাইমস, কাঠমাণ্ডু পোস্ট


-Kalerkantho