কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে চলেছে |

সার্ব অধ্যুষিত এলাকায় ঢোকার মুখে রাস্তায় ব্যারিকডে। সূত্র: এএফপি

পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধের মধ্যে বলকান অঞ্চলে সাবেক যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হওয়া কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। গত সোমবার সার্বিয়া তার সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে’ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কসোভোতে বসবাসকারী জাতিগত সার্বদের সঙ্গে প্রিস্টিনা সরকারের দ্বন্দ্বের জেরে সৃষ্ট এ উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়ায় কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

সার্বিয়ার সাবেক প্রদেশ কসোভো ২০০৮ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের বেশ কিছু দেশ স্বীকৃতি দিলেও সার্বিয়া এখনো কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা গত সোমবার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। ওই দিন সার্বিয়ার সেনাবাহিনী কসোভো সীমান্ত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে বড় ধরনের কামান ও ট্যাংক মোতায়েন করে। এর আগে সম্প্রতি কসোভোর উত্তরে সার্ব জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর শান্তিরক্ষী বাহিনী কসোভো ফোর্স (কেএফওআর) বলেছিল, সার্বদের স্থাপন করা ব্যারিকেডের কাছে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে কারা, কী উদ্দেশে গুলি ছুড়েছে তা নিশ্চিত নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর কসোভোর সঙ্গে সার্বিয়ার উত্তেজনা ইউরোপের বলকান অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবাদকে সম্প্রতি আবার চাঙ্গা করার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। রাশিয়ার সঙ্গে সার্বিয়ার পুরনো মিত্রতার কারণে এ নিয়ে যুদ্ধের শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা।

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুসিচ বলকান অঞ্চলে ‘সার্ব বিশ্বের’ স্বপ্ন দেখেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কার্তিকে তুলনা করে ‘ছোট জেলেনস্কি’ আখ্যা দিয়েছেন ভুসিচ।

ঐতিহ্যগতভাবেই সার্বরা রাশিয়ার প্রতি ভ্রাতৃপ্রতিম। কারণ রুশদের সঙ্গে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে ঘনিষ্ঠ। ইউক্রেন আক্রমণের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের আরোপিত অবরোধে সার্বিয়া অংশ নেয়নি। একটি জরিপে দেখা যায়, সার্বিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষই রাশিয়ার ওপর অবরোধে অংশগ্রহণের বিরোধী। উল্লেখ্য, রাশিয়ার গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল সার্বিয়া।

জাতিসংঘে কসোভোর সদস্য পদ ঠেকাতে রাশিয়াকে প্রয়োজন সার্বিয়ার। রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জোটের ২২টি দেশসহ বিশ্বের ১০০ দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার পর জাতিসংঘভুক্ত হতে চায় কসোভো। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ‘ভেটো ক্ষমতা’ প্রয়োগ করে তা ঠেকিয়ে দিতে পারে।

কসোভোতে সার্ব পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের জেরে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথাবার্তায়ও তা স্পষ্ট। কেএফওআর কর্তৃপক্ষের কাছে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুসিচ আহ্বান জানিয়েছেন যাতে কসোভোর উত্তরাঞ্চলে সার্বিয়ার বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কার্তি কেএফওআরের কাছে দাবি করেছেন ওই এলাকার প্রবেশমুখে সার্বদের ব্যারিকেড তোলার ব্যবস্থা করতে।  

কসোভোর সার্বরা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির পাশাপাশি ওই এলাকা থেকে বিশেষ পুলিশ প্রত্যাহারের দাবি করেছে। কসোভোর মূল অংশের সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে তারা।

সার্বিয়ার সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলবেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কসোভোর বিবাদ বেশ পুরনো। ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কসোভোর স্বাধীনতা লাভের পর এই দ্বন্দ্ব কিছুটা স্তিমিত হলেও পুরোপুরি মিটে যায়নি। জাতিগত আলবেনীয় ও সার্বদের বিবাদই এই সংকটের মূল কারণ। কসোভোতে বসবাসকারী সংখ্যালঘু সার্বরা আলবেনীয়দের শাসন মানে না।

চারটি পৌর অঞ্চলে বিভক্ত কসোভোর উত্তরাংশ চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে ইবার নদীর উত্তরে প্রিস্টিনাকেন্দ্রিক শাসকদের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ এলাকার সার্ব রাজনীতিকরা সার্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুসিচের অনুগত।

সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলে চোরাচালানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে কসোভোর। তারা প্রায়ই বিশেষ পুলিশের মাধ্যমে ওই এলাকায় অভিযান চালায়। সূত্র : ডয়চে ভেলে 


-Kalerkantho