২৭ দফার রূপরেখা কি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে |

গত ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ২৭ দফার একটি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা’ ঘোষণা করেন। এরই মধ্যে রূপরেখাটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের (বর্তমানে বিদেশে পলাতক) গাইডলাইন অনুসরণে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ঘোষিত খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’-এর ভিত্তিতেই ২০১৮ সালে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ না করলেই নয় যে ওয়েস্টিন হোটেলে রূপরেখাটি ঘোষণার আগে লন্ডন থেকে স্কাইপে তারেক রহমান রূপরেখাটি সুধীসমাজের কাছে তুলে ধরেন।

যদিও বিএনপি রূপরেখাটি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে একাত্ম ঘোষণাকারী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ করার কথা বলা হয়েছে, তবে তাদের চিন্তাভাবনা বা মতামত এই রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেই মনে হয়। আর রূপরেখায় যে ২৭টি দফা রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখ করার মতো নতুন কিছু আছে কি? কতগুলো কমিশন যেমন—কনস্টিটিউশন রিফর্ম কমিশন, ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন, ইলেকশন কমিশন, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস কমিশন, মিডিয়া কমিশন, ইকোনমিক রিফর্মস কমিশন, জুডিশিয়াল কমিশন ইত্যাদি গঠন করা ছাড়া নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন, ন্যায়পাল নিয়োগ, সংবিধানের সংশোধিত অনুচ্ছেদের পুনঃপ্রবর্তন ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। আরো বেশ কিছু ক্ষেত্রে যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গত দেড় দশকে ঘটে যাওয়া দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান এবং বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও ওই সব দফায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিএনপি এবং তার সঙ্গে থেকে যেসব দল বর্তমান সরকারকে হটাতে আন্দোলন করছে তারা যদি আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে একটি জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, তবেই তারা ওই রূপরেখায় উল্লিখিত দফাগুলো বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ যে নামেই রূপরেখাটি উপস্থাপন করা হয়ে থাকুক না কেন, এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী হলে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। ঐকমত্যের সরকার বলতে এ দেশের সাধারণ মানুষ যা বোঝে তা হলো দেশের সব রাজনৈতিক দল একমত হয়ে সরকার গঠন করবে। তারা কি মনে করছে যে আওয়ামী লীগ একটি আসনও পাবে না, সব আসনে তারা এবং তাদের অংশীদাররাই জয়ী হবে? সে রকম কিছু ঘটানো বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কখনোই সম্ভব হবে না, তা ওই দলের নেতারাও জানেন। তাহলে কোন পথে তাঁরা হাঁটার চিন্তা-ভাবনা করছেন? তাঁরা কি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন? এ প্রশ্নটি এলো এ জন্য যে বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিচালনায় নির্বাচন না হলে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। অন্য পথ হলে সেটি হতে পারে কোনো অসাংবিধানিক উপায় অবলম্বন করে, যেমন করে ওই দলটির জন্ম হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বা আগামীর বাংলাদেশে সেই পথে ক্ষমতা দখল কি কখনো সম্ভব হবে? তা না হলে ওই রূপরেখা যে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতোই আরো সাত বছর স্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে।

রূপরেখায় রাষ্ট্রকে অর্থাৎ বাংলাদেশকে মেরামত করার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি রাষ্ট্রকে মেরামত করার সুযোগ (বৈধ বা অবৈধ উপায়ে) বেশ কয়েকবারই পেয়েছিল। তখন তাদের কর্মকাণ্ড যে ঠিক উল্টোপথেই গেছে, রাষ্ট্রকাঠামোকে ধ্বংস করেছে। তাদের মুখে হঠাৎ মেরামতের কথা যেন ‘ভূতের মুখে রাম নাম’। ধরে নিলাম তাদের বোধোদয় হয়েছে, ক্ষতগুলো মেরামত করার তীব্র আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কারা সেটি করবে? দলের সেই সামর্থ্য রয়েছে কি? অবস্থা দেখে মনে হয়, বিএনপিকেই তো মেরামত করা দরকার। দলের ভাঙাচোরা বিষয়গুলো আগে মেরামত করা হোক, মেরামত করার মতো নেতৃত্ব তৈরি করা হোক, তারপরই রাষ্ট্রের মেরামতের বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করা যেতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না যে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন কারিগর ছাড়া কোনো মেরামত কাজে হাত দিতে যাওয়ার মতো বোকামি আর দ্বিতীয়টি নেই।

দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না বলে রূপরেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিগত দেড় দশকে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। খুবই ভালো কথা। আমজনতা সেটিই দেখতে চায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। কিন্তু শুধু বিগত দেড় দশকের কেন? এর আগে সংঘটিত সব দুর্নীতি কি দুর্নীতি ছিল না? তাদের দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার পেছনে কি কোনো উদ্দেশ্য আছে? নাকি আগের ওই সব দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কারো নির্দেশে এই রূপরেখায় এমনটি বলা হলো? আড়াল থেকে যাঁরা এসব দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তাঁদের দুর্নীতি কি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবে? দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও এর অন্তর্নিহিত ভাবটি সহজেই যে স্পষ্ট তা বিএনপির যারা এই রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন তারা ভালোভাবেই অবগত রয়েছেন। হয়তো তাদের করার কিছুই ছিল না। সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এমন অদ্ভুত সংকল্পকে প্রশংসা না করে কি পারা যায়?

মানবাধিকার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ইত্যাদি প্রসঙ্গও রূপরেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জানি না কেন তারা মাত্র গত দেড় দশকে ঘটে যাওয়া বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচারে হত্যা, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ ইত্যাদির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথা বলেছে। ওই সময়ের আগে ঘটে যাওয়া এসব কর্মকাণ্ডের কেন বিচার হবে না? ওই সব ঘটনার বিচার করলে তাদের দলের কেউ কি বেকায়দায় পড়ে যাবেন? না আবার কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে? ভেতরেই যখন এত ভয় ঢুকে আছে, তাহলে এসব বিষয় রূপরেখায় না আনলেই ভালো হতো না? ‘ঠাকুরঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’—প্রবাদটি আমাদের মনে না করিয়ে দিলেই তো ভালো হতো। কারণ দেশের জনগণ ভালো করেই জানে, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুমসহ নানা খুন-খারাবির সঙ্গে কাদের নাম এ দেশের রাজনীতির পাতায় অমোচনীয় কালিতে লেখা রয়েছে। তাদের সৎ উদ্দেশ্য ও সৎসাহস থাকলে এভাবে সময় বেঁধে দিত না।

নির্বাচনী ইশতেহারের মতোই গতানুগতিক কিছু প্রসঙ্গ রূপরেখায় এসেছে। ওসব নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবে বিএনপি হয়তো ভুলে যায়নি যে বাংলাদেশের একটি খুবই ভালো সংবিধান রয়েছে। আর সংবিধানের কোনো ধারা বা উপধারার (অনুচ্ছেদ বা উপ-অনুচ্ছেদের) সংশোধন আনার প্রক্রিয়াও সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। সংবিধানের গায়ে হাত দিতে গেলে সেই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ওই কর্মটি করতে গেলে শুধু বিএনপি কেন, যেকোনো দলকেই আগে তা অর্জন করতে হবে। নচেৎ অযথা এসব কথা না বলাই উত্তম। তাতে না আবার জনগণের মধ্যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়। তবে বিএনপির এসব কথা বলার পেছনে অবশ্যই কোনো হেতু রয়েছে। আর সেই হেতুর বিষয়টিও মনে হয় কারো কাছেই অজানা নয়।

বিএনপির রূপরেখার সার্বিক উদ্দেশ্য হলো একটি ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কি এ সম্পর্কে কোনো সামান্য ধারণা বা পরিচিতি আছে? বাংলাদেশের জনগণকে বিএনপি নতুন করে কী রেইনবো নেশন দেখাবে জানি না। তবে যে সম্প্রীতির বন্ধনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ম-গোত্র-নির্বিশেষে এই দেশের সব মানুষ আবদ্ধ হয়েছিল তা কি ‘রেইনবো নেশন’-এর চেয়ে কম? বাংলাদেশের মানুষ সেই তখন থেকেই কাঁধে কাঁধ রেখে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আফ্রিকার ওই ধারণা বাস্তবায়ন করার এমন অহেতুক উদ্ভট চিন্তা বিএনপির মাথায় কোন কারণে ভর করেছে বোধগম্য নয়। বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মধ্যে বিদ্যমান সম্প্রীতিই আগামী দিনে বাংলাদেশকে আরো সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিএনপির ওই রেইনবো চিন্তা-ভাবনা কাগজ-কলমেই রয়ে যাবে।

ভালো ভালো কথা বলা বা লেখা খুব একটা কঠিন কাজ নয়, যতটা কঠিন ওই সব কথার বাস্তবায়ন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে কথার ফুলঝুরি ছড়াতে আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক দল এরই মধ্যে বেশ পারঙ্গমতা অর্জন করেছে। যাহোক, বিএনপির রূপরেখাটিতে ২৭টি দফায় আশা-ভরসার নানা স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। যেসব কর্মযজ্ঞের বর্ণনা এখানে করা হয়েছে তা পূরণ করা কতটা সম্ভব হবে তা বিএনপি ভালো করেই জানে। তবে নিজেদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং যা হবে জনগণের কল্যাণে, তেমন চিন্তা-ভাবনার মধ্যে থাকাটাই শ্রেয়। অযথা জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার রাজনৈতিক কথাবার্তা পরিহার করা দলের জন্যই কল্যাণকর। যে দল যেকোনো পরিকল্পনাই করুক না কেন তা বাস্তবায়ন করার নেতৃত্ব না থাকলে খাতা-কলমে আর কথাবার্তাতেই তা সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। দলকে সেই শক্তি আগে অর্জন করতে হবে, যা একমাত্র জনগণই অর্পণ করতে পারে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


-Kalerkantho